একটি জয় অথচ তার গল্প যেন অনেকগুলো নায়কের। ডারউইনের আকাশে বাংলাদেশের ক্রিকেট লিখল নতুন ইতিহাস। বল হাতে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং দুর্গে প্রথম আঘাতটা করেন হাসান মাহমুদ, ব্যাট হাতে ইতিহাস গড়েছেন তানজিদ হাসান তামিম, আর ব্যাট-বল দুটিতেই লড়াইয়ের আগুন জ্বেলে সামনে থেকে পথ দেখিয়েছেন মেহেদী হাসান মিরাজ। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের এক নম্বর দলের বিপক্ষে বাংলাদেশের এই জয় বিশ্বাস, পরিকল্পনা, ধৈর্য আর দলীয় সামর্থ্যের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি।
ডারউইন টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে নয় উইকেটে হারিয়ে দুই ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এটি বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়। নয় উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরার পুরস্কার উঠেছে হাসান মাহমুদের হাতে। তার পারফরম্যান্সকে ছাপিয়ে আলোচনায় এসেছে মিরাজের অলরাউন্ড নৈপুণ্যও। ম্যাচ শেষে হাসান জানিয়েছেন, ফলাফল নিয়ে না ভেবে নিজেদের পরিকল্পনা ও সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাস রাখাই ছিল তাদের সাফল্যের মূলমন্ত্র। তিনি বলেন, ‘ম্যাচের আগে অনুশীলন সেশনে আমরা প্রতিটি মুহূর্তে নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। ফল কী হবে, সেটা না ভেবে নিজেদের ওপর বিশ্বাস রেখেছি। কোচদের সঙ্গে আমরা দলীয় পরিকল্পনা করেছি। ভিডিও দেখে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের নিয়ে কাজ করেছি। মাঠে গিয়ে আমরা সেই পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করেছি।’ ডারউইনের উইকেটে বোলারদের ধৈর্যকেই সাফল্যের অন্যতম কারণ মনে করেন হাসান। তিনি বলেন, ‘বোলাররা ধৈর্য ধরে বোলিং করেছে। সবাই সঠিক লাইন ও লেংথে বল করার চেষ্টা করেছে। শেষ পর্যন্ত সেখান থেকেই ফল এসেছে।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে আমার জন্য সবাই নিশ্চয়ই অনেক খুশি হবে। আমার এলাকার মানুষজনও উদ্যাপন করবে।’
তবে এই জয়ের গল্পে মিরাজের অবদানও বিরাট কিছু। ম্যাচ জয় নিয়ে মিরাজ বলেন, ‘আমাদের ক্রিকেট ছিল অসাধারণ। অনেক দিন পর আমরা এখানে এসেছি। পুরো দলের পারফরম্যান্স ছিল দুর্দান্ত। আমরা নিজেদের চরিত্র দেখাতে পেরেছি।’ প্রস্তুতি ম্যাচে তার সেঞ্চুরি দলকে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল কি না, এমন প্রশ্নে মিরাজের উত্তরেও ছিল বিশ্বাসের কথা। তিনি বলেন, ‘আমাদের বিশ্বাস ছিল। অস্ট্রেলিয়া বিশ্বমানের দল, তাদের অনেক ভালো খেলোয়াড় আছে। আমরা জানতাম, তাদের হারাতে পারলে সেটা আমাদের দেশ ও ক্রিকেটের জন্য অনেক বড় ব্যাপার হবে। আমাদের একটাই বার্তা ছিল বিশ্বাস রাখতে হবে। বিশ্বাস না থাকলে এটা সম্ভব নয়।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের ব্যাটাররা ভালো ব্যাটিং করেছে এবং সঠিক সময়ে বোলাররাও ভালো করেছে। প্রথম ইনিংসে তানজিদ তামিম যেভাবে ব্যাটিং করেছে, শান্ত ও মুমিনুল ভাইও খুব ভালো করেছেন। এরপর লোয়ার অর্ডারের সঙ্গে আমার যে জুটিগুলো হয়েছে, সেগুলোও দারুণ ছিল। লোয়ার অর্ডার যদি দ্রুত আউট হয়ে যেত তাহলে আমি আমার রানটা করতে পারতাম না।’
দ্বিতীয় ইনিংসে বল হাতে মিরাজের পাঁচ উইকেটের মধ্যে ছিল স্টিভেন স্মিথের গুরুত্বপূর্ণ উইকেটও। উইকেটের ফুটমার্ক স্পিনারদের সহায়তা করেছে বলে মনে করেন তিনি। প্রথম ইনিংসে হাসান মাহমুদের ছয় উইকেট এবং দ্বিতীয় ইনিংসে স্পিনারদের ছয় শিকার দুই বিভাগেই বাংলাদেশের পরিকল্পনা কাজে লেগেছে। ম্যাকেতে দ্বিতীয় টেস্টেও একই আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে চান এই ডানহাতি অলরাউন্ডার। তিনি বলেন, ‘আমাদের ভাবতে হবে, এই কন্ডিশনে কীভাবে ভালো করা যায়। আমাদের ব্যাটিং ও বোলিং দুই বিভাগেই সঠিক সময়ে ভালো করতে হবে।’ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর নেতৃত্বেরও প্রশংসা করেছেন মিরাজ। দেশের মানুষের প্রতিক্রিয়া নিয়েও আবেগ লুকাতে পারেননি। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ের মুহূর্তে গ্যালারিতে থাকা প্রবাসী দর্শকদের ধন্যবাদ জানান তিনি। মিরাজ বলেন, ‘সবাই খুব খুশি। তারা খুব গর্বিত। এটা আমাদের জন্য গর্বের মুহূর্ত। অনেক দর্শক এখানে এসে আমাদের সমর্থন করেছেন। তাদের ধন্যবাদ। তারা বিশ্বাস করেছিলেন যে আমরা ম্যাচটি জিততে পারি, আর সেই বিশ্বাসই আমাদের আরও অনুপ্রাণিত করেছে।’ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে যে ইতিহাসের দরজা এতদিন বন্ধ ছিল, ডারউইনে এই জয় সেই দরজাই এবার খুলে দিল বাংলাদেশ।


